ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনামলে ৬০০০ গুমের ৯৬.৭ শতাংশই জামায়াত-শিবির ও বিএনপির নেতাকর্মী

প্রবাস কন্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট:
বাংলাদেশে গত ১৫ বছরে জোরপূর্বক গুম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত, প্রাতিষ্ঠানিক এবং রাজনৈতিকভাবে লক্ষ্যযুক্ত চর্চা। ‘জোরপূর্বক গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন’-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গুমের প্রকৃত সংখ্যা ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার হতে পারে, যা সরকারি রেকর্ডের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি।
গতকাল রবিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এই ঐতিহাসিক প্রতিবেদনটি জমা দেন কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও অন্যান্য সদস্যরা। প্রতিবেদন গ্রহণ করে প্রধান উপদেষ্টা একে ‘পৈশাচিকতার ডকুমেন্টেশন’ হিসেবে অভিহিত করেন।
কমিশন জানায়, মোট ১,৯১৩টি অভিযোগের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১,৫৬৯টি ঘটনা গুম হিসেবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। প্রতিবেদনে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে: ২৮৭ জন ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে রয়েছেন। এর মধ্যে ২৫১ জন চিরতরে নিখোঁজ এবং ৩৬ জনের গুলিবিদ্ধ লাশ নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে যাদের রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে, তাদের ৯৬.৭ শতাংশই বিরোধী দলের (বিএনপি ও জামায়াত-শিবির) নেতাকর্মী। গুম হওয়া ব্যক্তিদের ৯৮.৫ শতাংশই পুরুষ। তবে সামাজিক ভয়ের কারণে নারীদের তথ্য কম এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তদন্তে দেখা গেছে, বরিশালের বলেশ্বর নদী ছিল লাশ গুমের প্রধান কেন্দ্র। এছাড়া বুড়িগঙ্গা ও মুন্সীগঞ্জেও লাশ ফেলার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুমের এই ব্যবস্থাটি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশ ছাড়া সম্ভব ছিল না। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি নির্দেশদাতা ছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া তার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে। অন্যান্য অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক এনটিএমসি মহাপরিচালক জিয়াউল আহসান, পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম এবং হারুন অর রশীদ।
তদন্ত অনুযায়ী, গুমের ২৫ শতাংশ ঘটনার জন্য দায়ী র্যাব। এছাড়া পুলিশ ২৩ শতাংশ এবং ডিবি ১৪.৫ শতাংশ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। ডিজিএফআই ও এনএসআই-এর নামও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে একাধিক সংস্থা মিলে যৌথ অপারেশন চালিয়েছে, যা একটি সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধের ইঙ্গিত দেয়।
প্রতিবেদনটি পাওয়ার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “মানুষ কত নিচে নামতে পারে, কত পৈশাচিক হতে পারে—এটা তার ডকুমেন্টেশন। গণতন্ত্রের লেবাস পরে মানুষের ওপর এই পৈশাচিক আচরণ করা হয়েছে।” তিনি এই রিপোর্ট সহজ ভাষায় জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এবং ভবিষ্যতে যেন এমন নৃশংসতা আর না ঘটে, সেজন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের নির্দেশ দেন।
কমিশন সদস্যরা জানান, গুমের শিকার অনেককে গোপনে ভারতে হস্তান্তর (রেন্ডিশন) করার তথ্যও পাওয়া গেছে। সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই প্রতিবেদনের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে।
বার্তাবাজার/এমএইচ
প্রবাস কন্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট/আ/মু
Source: bartabazar.com

