গণভোট ঘিরে বিএনপির মুনাফিকি পরিকল্পনা: কেন্দ্রের লোক দেখানো ‘হ্যাঁ’, তৃণমূলে ‘না’

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই সঙ্গে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নে ঐতিহাসিক গণভোট। এই গণভোটকে কেন্দ্র করে সংসদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিএনপির ভেতরে এক চরম স্ববিরোধী ও দ্বিমুখী অবস্থান ফুটে উঠেছে।
কেন্দ্রে ‘হ্যাঁ’ ভোটের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা
গত ২১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয় যে, তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’–এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দলটির নির্বাচনী পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আমাদের ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবের মৌলিক ভিত্তিগুলো জুলাই সনদে প্রতিফলিত হয়েছে, তাই আমরা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সবাইকে নির্দেশ দিয়েছি।” এমনকি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও তাঁর বক্তব্যে ইতিবাচক সংস্কারের কথা বলছেন।
তৃণমূলে ‘না’ ভোটের গোপন ও প্রকাশ্য প্রচারণা
কেন্দ্রীয়ভাবে ‘হ্যাঁ’ বললেও দেশের তৃণমূল পর্যায়ে এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিএনপির চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত কয়েকদিন ধরে ফেসবুক, এক্স (টুইটার) এবং ইউটিউবে বিএনপির মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সরাসরি ‘না’ ভোটের প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে।
অনলাইন প্রচারণা: ফেসবুকে ‘হ্যাঁ-না’ প্রতিযোগিতায় বিএনপির সমর্থক ও ছাত্রদলের অনেক কর্মীকে ‘না’ লেখা পোস্টার শেয়ার করতে দেখা যাচ্ছে। তাঁদের যুক্তি, জুলাই সনদের অনেক প্রস্তাব ইসলামী মূল্যবোধের পরিপন্থী এবং এটি সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা অতিরিক্ত কমিয়ে দেবে।
চট্টগ্রামের উদাহরণ: চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান গণভোটে ‘না’ ভোটের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। একইভাবে চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহও ব্যক্তিগতভাবে ‘না’ ভোটের পক্ষে মতামত দিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি করেছেন।
বোরকা ইস্যু ও ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট: তৃণমূলের অনেক জায়গায় প্রচার করা হচ্ছে যে, এই সনদ পাস হলে ধর্মীয় শিক্ষায় বাধা আসবে। একটি ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গেছে, তৃণমূলের কর্মীরা বলছেন, “যারা মা-বোনের বোরকা খুলতে চায়, তারা ক্ষমতায় এলে দেশকে বিবস্ত্র করবে।” মূলত ধর্মীয় সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগিয়ে ভোটারদের ‘না’ ভোটের দিকে ধাবিত করা হচ্ছে।
কেন এই দ্বিমুখী নীতি?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি এখানে একটি সুকৌশলী অবস্থান নিয়েছে: ১. আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা: বিদেশে এবং সুশীল সমাজের কাছে নিজেদের প্রগতিশীল ও সংস্কারপন্থী হিসেবে তুলে ধরতে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ‘হ্যাঁ’ বলছে। ২. ক্ষমতার ভারসাম্য: তারা আশঙ্কা করছে জুলাই সনদে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করা হলে ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গিয়ে তারা নিরঙ্কুশ শাসন চালাতে পারবে না। তাই তারা চায় জনগণই যেন ভোটের মাধ্যমে এই সনদ বাতিল করে দেয়। ৩. ধর্মীয় ভোট ব্যাংক: জামায়াত বা অন্যান্য ইসলামী দলগুলোর কঠোর সংস্কারপন্থী ইমেজের বিপরীতে তৃণমূলের ভোটারদের ধরে রাখতে তারা পর্দার আড়ালে রক্ষণশীল প্রচারণাকে উসকে দিচ্ছে।
ভোটারদের প্রতিক্রিয়া
সাধারণ ভোটার এবং জেন-জি প্রজন্মের বিপ্লবীদের মধ্যে বিএনপির এই অবস্থানে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। জাতীয় নাগরিক কমিটির (NCP) অনেক নেতা অভিযোগ করেছেন, এটি শহীদদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। ছাত্র নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ এক বক্তব্যে বলেছেন, “মুখে সংস্কারের কথা বলে তলে তলে না ভোটের প্রচারণা চালানো মূলত পুরনো স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই টিকিয়ে রাখার নামান্তর।”
আগামীকালকের ভোটে এই ‘হ্যাঁ-না’ লড়াই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সংবিধান ও ক্ষমতার কাঠামো কেমন হবে। তবে বিএনপির এই দ্বিমুখী আচরণ দলটির বিশ্বাসযোগ্যতাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
