Bd বাংলাদেশ

টাইম ম্যাগাজিনে তারেক রহমানকে বলা হলো “খাম্বা তারেক” (পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ)

টাইম ম্যাগাজিনে তারেক রহমানকে নিয়ে একটা নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে যেখানে বলা হয়েছে তারক রহমানকে বাংলাদেশীরা চিনে ‘খাম্বা তারেক’ হিসেবে। এখানে মূল নিবন্ধটির বাংলা অনুবাদ দেওয়া হলো:

## এক্সক্লুসিভ: বাংলাদেশের হারানো সন্তান

তারেক রহমানের কণ্ঠস্বর ভেঙে গেছে। ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দক্ষিণ এশীয় দেশ বাংলাদেশের হবু নেতার জন্য এটি খুব একটা আদর্শ পরিস্থিতি নয়। বিষয়টি কিছুটা বিদ্রূপাত্মকও বটে; কারণ তার জন্মভূমির কার্যত বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে রহমানের বক্তব্য প্রচারের ওপর গত এক দশক ধরে নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছিলেন স্বৈরাচারী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

“আমার শরীর এই স্থানীয় আবহাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে,” ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে স্বদেশে ফেরার পর প্রথম সাক্ষাৎকারে টাইমের (TIME) সাথে আলাপকালে রহমান বলেন। বাগানবিলাস আর গাঁদা ফুলে সজ্জিত পারিবারিক বাসভবনের বাগানে বসে তিনি আরও যোগ করেন, “এমনিতেও আমি কথা বলায় খুব একটা পারদর্শী নই,” তিনি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেন, “তবে আপনি যদি আমাকে কিছু করতে বলেন, আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করি।”

গত কয়েক সপ্তাহ রহমানের জন্য ছিল ঝঞ্ঝাবিক্ষত। গত ২৫ ডিসেম্বর তিনি বাংলাদেশে পৌঁছান, যেখানে ঢাকা বিমানবন্দরে রাতভর অপেক্ষারত লাখো সমর্থক তাকে উচ্ছ্বসিত অভ্যর্থনা জানায়। এর মাত্র পাঁচ দিন পর, দীর্ঘ অসুস্থতার পর তার মা, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মারা যান। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে রাজধানীর রাজপথে মানুষের ঢল নামে। “আমার বুকটা খুব ভারী হয়ে আছে,” ছলছল চোখে রহমান বলেন। “তবে তাঁর কাছ থেকে আমি যে শিক্ষাটি পেয়েছি তা হলো—যখন আপনার কাঁধে কোনো দায়িত্ব থাকে, তখন আপনাকে তা পালন করতেই হবে।”

সেই দায়িত্বটি সম্ভবত তাঁর মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করার চেয়ে কম কিছু নয়। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে রহমান স্পষ্টতই অগ্রগামী প্রার্থী। ১৮ মাস আগে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর এই নির্বাচনের ডাক দেওয়া হয়। রহমান নিজেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের সেই রাজনৈতিক আভিজাত্য এবং তরুণ বিপ্লবীদের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে একীভূত করার সেতু হিসেবে তুলে ধরছেন।

বর্তমানে অনেক সমস্যার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। বাংলাদেশ উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং টাকার মান কমে যাওয়ার সংকটে ভুগছে, যা সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমিয়ে দিয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় আমদানিতে বিধিনিষেধ এসেছে, যা উৎপাদন এবং জ্বালানি সরবরাহকে ব্যাহত করছে। এসব প্রতিকূলতা তৈরি পোশাক রপ্তানি এবং রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল জাতীয় অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টায় বাধা দিচ্ছে। যেখানে যুব বেকারত্বের হার ১৩.৫% এবং প্রতি বছর ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে, সেখানে নতুন প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি।

তবে রহমানের সাথে কিছু বিতর্কও জড়িয়ে আছে। তার প্রধান পরিচয় বংশীয়—জিয়া এবং স্বাধীনতার নায়ক জিয়াউর রহমানের ছেলে হিসেবে ৬০ বছর বয়সী এই নেতা সেই প্রতিদ্বন্দ্বী দ্বৈত শাসনের বিপরীত মেরুর প্রতিনিধিত্ব করেন, যারা শুরু থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে (হাসিনা ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের কন্যা)।

সমর্থকদের কাছে রহমান একজন নির্যাতিত উদ্ধারকর্তা, যিনি তাঁর বিপর্যস্ত জন্মভূমিকে বাঁচাতে ফিরে এসেছেন। বিরোধীদের কাছে তিনি একজন ‘অন্ধকার রাজপুত্র’, একজন অর্থলোভী এবং সুবিধাভোগী বিশ্ববিদ্যালয় ড্রপআউট যার একমাত্র যোগ্যতা হলো তাঁর জন্মপরিচয়। তবে রহমান জোর দিয়ে বলেন যে, তিনি তাঁর বিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য সঠিক ব্যক্তি। “আমি আমার বাবা-মায়ের সন্তান বলে এখানে নেই,” তিনি বলেন। “আমার দলের সমর্থকরাই আজ আমার এখানে থাকার কারণ।”

বাংলাদেশিরা আপাতত তাঁর কথায় বিশ্বাস রাখতে ইচ্ছুক বলে মনে হচ্ছে। ডিসেম্বরের শেষের দিকের জনমত জরিপ অনুযায়ী, তাঁর দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সমর্থন প্রায় ৭০%, যেখানে তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধান ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন ১৯%।

তবুও মানুষের মনে উদ্বেগ কাজ করছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির শেষ মেয়াদে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশকে টানা চার বছর বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। সংস্কারপন্থীরা আশঙ্কা করছেন যে, হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যে ১,৪০০ জন আন্দোলনকারী প্রাণ দিয়েছেন, তাদের রক্ত যেন আবারও কোনো আত্মকেন্দ্রিক বংশধরকে ক্ষমতায় না আনে।

রহমান দুর্নীতির সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাঁর আগের সব সাজা বাতিল করেছে। তাঁর অভিযুক্তদের সম্পর্কে তিনি বলেন, “তারা কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি।” এটি অবশ্যই সত্য যে, হাসিনার আওয়ামী লীগ একটি অনুগত সংবাদমাধ্যমের সহায়তায় তাঁর বিরুদ্ধে অন্ধভাবে অভিযোগ প্রচার করেছিল। তবে এটিও সমানভাবে সত্য যে, রহমান সেই একই বংশানুক্রমিক সুযোগ-সুবিধার মধ্যে বেড়ে উঠেছেন যেটির বিরুদ্ধে জুলাই বিপ্লব গর্জে উঠেছিল।

দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম এই অর্থনীতি নিয়মিতভাবে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে সর্বোচ্চ অবদান রাখে এবং মার্কিন ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের সাথে মহড়ায় অংশ নেয়। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশটি পার্শ্ববর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারে গণহত্যা থেকে বাঁচতে পালিয়ে আসা ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় উৎস এবং রপ্তানির প্রধান গন্তব্য। একই সঙ্গে দেশটি হাই-টেক ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যা স্যামসাংয়ের মতো আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে চীন থেকে তাদের সাপ্লাই চেইন সরিয়ে আনতে সাহায্য করছে। তবে বেইজিংও বাংলাদেশের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চায়, কারণ বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত অবস্থান দক্ষিণ চীন সাগরে কোনো অবরোধের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।

আশা করা হচ্ছে যে, নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের শুরু করা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো পুনরায় স্বৈরতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়া রোধ করতে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য বজায় রাখবে। এবং এটিও আশা করা হচ্ছে যে, রহমান তাঁর রাজনৈতিক নির্বাসনের বছরগুলোতে আত্ম-প্রতিফলন এবং বিকাশের মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষেই জনগণের নেতা হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছেন।

“যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের প্রতি আমাদের বিশাল দায়িত্ব রয়েছে,” তিনি বলেন। “আমাদের একসাথে কাজ করতে হবে, ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, যাতে মানুষ তাদের রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পায়।”

রহমানকে দেখে মৃদুভাষী এবং অন্তর্মুখী মনে হয়, যিনি কথা বলার চেয়ে শুনতে বেশি পছন্দ করেন। লন্ডনে তাঁর প্রিয় শখ ছিল রিচমন্ড পার্কের গাছের নিচে নিজের চিন্তায় মগ্ন হয়ে হাঁটা অথবা ইতিহাসের বই পড়া। তাঁর প্রিয় সিনেমা হলো *এয়ার ফোর্স ওয়ান*। “আমি সম্ভবত এটি আটবার দেখেছি!” তিনি হাসিমুখে জানান।

রহমানকে একজন পলিসি বিশেষজ্ঞ হিসেবে মনে হয় যিনি যে কোনো বিষয়ে তথ্য ও পরিসংখ্যান তুলে ধরতে পারেন। তিনি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখতে ১২,০০০ মাইল খাল খনন করতে চান, ভূমিক্ষয় রোধে বছরে ৫ কোটি গাছ লাগাতে চান এবং ধোঁয়াশাচ্ছন্ন রাজধানী ঢাকার শ্বাস নেওয়ার জন্য ৫০টি নতুন সবুজ এলাকা (পার্ক) তৈরি করতে চান। তাঁর পরিকল্পনায় রয়েছে বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন, প্রবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কারিগরি কলেজগুলোকে পুনর্গঠন এবং একটি ভারাক্রান্ত রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার চাপ কমাতে বেসরকারি হাসপাতালের সাথে অংশীদারিত্ব করা।

“আমি যা পরিকল্পনা করেছি তার মাত্র ৩০% যদি বাস্তবায়ন করতে পারি, তবে আমি নিশ্চিত যে বাংলাদেশের মানুষ আমাকে সমর্থন করবে,” তিনি বলেন।

রহমানের বিতর্কিত ভাবমূর্তির বাইরে এটি একটি সম্পূর্ণ টেকনোক্র্যাটিক বা প্রযুক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন এবং আশির দশকের মাঝামাঝি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে একটি বিমান বাহিনী স্কুলে পড়াশোনা করেন। তবে তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে তাঁর ডিগ্রি শেষ করতে পারেননি, দ্বিতীয় বর্ষেই পড়া ছেড়ে দেন। পরবর্তীকালে তিনি ব্যবসায় যোগ দেন এবং নব্বইয়ের দশকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে উন্নীত হন। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে তাঁর ক্রমবর্ধমান প্রভাব তাঁকে দলের কৌশলের প্রধান ব্যক্তিত্ব যেমন করে তুলেছিল, তেমনি বিতর্কিতও করেছিল; সমালোচকরা তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি এবং প্রশাসনে অযাচিত হস্তক্ষেপের অভিযোগ তোলেন।

অনেক বাংলাদেশির কাছে রহমান এখনও অবজ্ঞার সাথে ‘খাম্বা তারেক’ নামে পরিচিত। এটি একটি কথিত দুর্নীতি কেলেঙ্কারির ইঙ্গিত দেয় যেখানে হাজার হাজার বিদ্যুতের খুঁটি বা ‘খাম্বা’ একজন সহযোগীর কাছ থেকে চড়া দামে কেনা হয়েছিল কিন্তু সেগুলো কখনও গ্রিডে সংযুক্ত করা হয়নি। যদিও রহমান কঠোরভাবে কোনো অনিয়মের কথা অস্বীকার করেন, তবুও ২০০৮ সালে ফাঁস হওয়া একটি মার্কিন কূটনৈতিক কেবলে তাঁকে “ক্লেপটোক্র্যাটিক (চৌর্যতন্ত্র) সরকার এবং সহিংস রাজনীতির প্রতীক” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং “নির্লজ্জভাবে এবং ঘন ঘন ঘুষ দাবি করার” অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

২০০৭-২০০৮ সালের সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রহমান আত্মসাৎ, অর্থপাচার এবং আওয়ামী লীগের একটি বহরে গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনাসহ ৮৪টি অভিযোগে ১৮ মাস কারাবরণ করেন। কারাগারে তিনি নির্যাতনের শিকার হন যা তাঁর মেরুদণ্ডে সমস্যার সৃষ্টি করে এবং সেটি আজও তাঁকে ভোগায়। মূলত চিকিৎসার জন্য তিনি যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলেন। “শীত বেশি হলে আমার পিঠে ব্যথা হয়,” তিনি বলেন। “তবে আমি এটাকে জনগণের প্রতি আমার দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার একটি স্মারক হিসেবে দেখি। আমাকে আমার সেরাটা দিতে হবে যাতে ভবিষ্যতে অন্য কাউকে এই ধরনের কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।” ২০১৮ সালে তাঁর অসুস্থ মা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করা দুর্নীতির অভিযোগে আটক হওয়ার পর, রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন এবং বিদেশ থেকে ভিডিও লিংকের মাধ্যমে দলের কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

সেই অন্তর্বর্তী সময়ের অনেকটা জুড়েই বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে। এটি এশিয়া-প্যাসিফিকের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে, যেখানে ২০০৬ সালে জিডিপি ছিল ৭১ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২২ সালে ৪৬০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। কিন্তু একই সাথে আওয়ামী লীগ আরও বেশি দমনমূলক হয়ে ওঠে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মতে, হাসিনার শাসনামলের শেষ ১৫ বছরে প্রায় ৩,৫০০ মানুষকে বিচারবহির্ভূতভাবে গুম করা হয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিকীকরণ করা হয়েছিল, যা সামরিক বাহিনী, আদালত, সিভিল সার্ভিস এবং বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর গভীর আস্থার সংকট তৈরি করে। স্বাধীন সাংবাদিক এবং সুশীল সমাজ নজরদারি ও হয়রানির অভিযোগ তোলেন।

সময়ের সাথে সাথে ব্যয় বৃদ্ধি, বৈষম্য এবং যুব বেকারত্ব আকাশচুম্বী হওয়ায় অর্থনৈতিক সূচকগুলো নেতিবাচক হয়ে পড়ে। জুলাই অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল সরকারের অনুগতদের জন্য চাকরির কোটার বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের মাধ্যমে, কিন্তু হাসিনার কঠোর দমন-পীড়ন রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বারুদে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এর ফলে হাজার হাজার কিশোর, বৃদ্ধ, অধ্যাপক ও সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে আসে।

বিক্ষোভকারীরা ঢাকার হাসিনার সরকারি বাসভবনের দিকে অগ্রসর হলে তিনি সামরিক হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে যান। সেখানে তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সাথে অবস্থান করছেন এবং তাঁর ক্ষমতাচ্যুতি ও আসন্ন নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়ার প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। “ভোটারদের বিকল্পের মধ্যে থেকে বেছে নেওয়ার অধিকার দিতে হবে,” হাসিনা টাইমসকে বলেন। “যতক্ষণ না বাংলাদেশ একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দিচ্ছে যেখানে সব বড় দল অংশ নিতে পারবে, ততক্ষণ গণতন্ত্রের কোনো আশা নেই।”

গণতন্ত্র ধ্বংস নিয়ে হাসিনার এই অভিযোগ রহমানের কাছে বিশেষভাবে হাস্যকর মনে হয়, বিশেষ করে হাসিনা যে পরিমাণ রক্তপাতের নেতৃত্ব দিয়েছেন তার কথা বিবেচনা করলে। যেখানে লাঠি ও পাথর হাতে আন্দোলনকারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনী সাঁজোয়া যান চালিয়েছে, এমনকি হেলিকপ্টার থেকে ভিড়ের ওপর গুলিও চালিয়েছে। “যে কেউ অপরাধ করুক না কেন, এই দেশে আইন ও নিয়ম রয়েছে,” তিনি বলেন। “তাই তাদের শাস্তি পেতেই হবে।” গত নভেম্বরে একটি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, হাসিনা যদি কখনও বাংলাদেশে ফিরে আসেন তবে সেই শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড।

তবে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখার সিদ্ধান্তটি বেশ বিতর্কিত। শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় সম্প্রতি রয়টার্সকে বলেছেন যে, দলীয় নেতা-কর্মীদের নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগকে ছাড়া আমরা কোনো নির্বাচন হতে দেব না। আমাদের প্রতিবাদ দিন দিন আরও জোরালো হবে… শেষ পর্যন্ত সম্ভবত সংঘাতের সৃষ্টি হবে।”

এ ধরনের অশান্তি ওয়াশিংটনের সমর্থন আদায়ে খুব একটা সহায়ক হবে না। সেখানে সংখ্যালঘুদের ওপর বিচ্ছিন্ন কিছু হামলাকে আওয়ামী লীগ এমনভাবে প্রচার করেছে যেন মনে হয় উগ্র ইসলামপন্থীরা দেশের নিয়ন্ত্রণ দখল করেছে। আওয়ামী লীগ এবং প্রভাবশালী ভারতীয়রা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য প্ররোচিত করে আসছিলেন। সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের ওপর ২০% ‘পারস্পরিক’ শুল্ক আরোপ করেছে, যা দেশটির রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতিকে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। রহমান বলছেন যে, তিনি দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর উপায় খুঁজছেন এবং সম্ভবত বোয়িং বিমান ও মার্কিন জ্বালানি অবকাঠামো কেনার বিনিময়ে এই চাপ কমানোর বিষয়ে আলোচনার চেষ্টা করছেন।

ট্রাম্প সম্পর্কে রহমান বলেন, “ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দেশের স্বার্থ দেখবেন, আর আমি আমার দেশের স্বার্থ দেখব। তবে আমরা একে অপরকে সাহায্যও করতে পারি। আমি নিশ্চিত মিস্টার ট্রাম্প একজন অত্যন্ত যুক্তিবাদী মানুষ।”

জুলাই বিপ্লবের স্মৃতিচিহ্নগুলো এখনও বাংলাদেশের রাজধানীতে ছড়িয়ে আছে। দেয়ালে আঁকা নজরকাড়া সব ম্যুরালে হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি উদযাপন করা হচ্ছে—কোথাও অপসারিত এই স্বৈরাচারীকে শয়তানের শিং দিয়ে বা লুটের বস্তা দিয়ে ঘেরা অবস্থায় দেখানো হয়েছে। দেয়ালের স্লোগানগুলো বলছে: “বাংলাদেশি পুলিশের জন্য ধিক্কার!” এবং “এটি জেন-জি’র তৈরি এক নতুন বাংলাদেশ।”

ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের হাত ধরে গঠিত নতুন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি’র (NCP) ২৬ বছর বয়সী প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “জুলাইয়ের পর মানুষ বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র এবং পুলিশকে স্বাধীন করে পুরো ব্যবস্থার পরিবর্তন চেয়েছিল।” রহমানের ব্যাপারে আবদুল্লাহ এখনই কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য করতে রাজি নন, তবে এখন পর্যন্ত যা দেখছেন তা তাঁর পছন্দ হয়েছে। তিনি বলেন, “তারেক রহমান সত্যিই ভালো করছেন। বিএনপির মতো একটি দল চালানো খুবই কঠিন। তাঁর কাজের মূল্যায়ন করার জন্য এটি খুব দ্রুত হয়ে যায়, তবে এখন পর্যন্ত তিনি দারুণ কাজ করছেন।”

সংস্কারের সাফল্যের বিষয়েও সংশয় রয়ে গেছে। বিপ্লবী ম্যুরালগুলো যেমন রোদে পুড়ে বিবর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি শিক্ষার্থীদের বিজয়ের সেই উদ্দীপনাও এখন অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর বিভাজনে মলিন হয়ে পড়ছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থেকে সব রাজনৈতিক দলকে বাইরে রাখা হয়েছিল। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসেরও কোনো প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা না থাকায় এই প্রচেষ্টায় প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির অভাব দেখা দেয়। নারী সমাজ এই অভ্যুত্থানের অগ্রভাগে থাকলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে তারা অনেকটা কোণঠাসা। ছয়টি সংস্কার কমিশনের মধ্যে মাত্র একটির (নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন) প্রধান ছিলেন একজন নারী। কিন্তু সেটিও ইসলামপন্থীদের কট্টর প্রতিবাদের মুখে পড়ে; তারা দাবি করে যে লিঙ্গ সমতার প্রস্তাবগুলো শরিয়াহ আইনের বিরোধী। ফলে সেই প্রস্তাবগুলো স্থগিত করা হয়।

অবশ্য কিছু সাফল্যও এসেছে: গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন ১,৯১৩টি অভিযোগ যাচাই করে ১,৫৬৯টি গুমের ঘটনার সত্যতা পেয়েছে, যার মধ্যে ২৮৭টি মামলা ছিল “নিখোঁজ ও মৃত” ক্যাটাগরির (এদের প্রায় সবাই জামায়াত বা বিএনপির সদস্য ছিলেন)। সশস্ত্র বাহিনীর চাপ থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্তদের বেসামরিক আদালতে বিচার করা হচ্ছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক আলোচনার পরিবেশও এখন অনেক উন্মুক্ত। শেখ হাসিনার আমলে ৪৪ দিন গুম থাকা পশ্চিমা সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডজান্ট প্রফেসর মুবাশার হাসান স্মরণ করেন যে, সম্প্রতি তিনি সামরিক বাহিনী, বিচার বিভাগ এবং গোয়েন্দা সংস্থার রাজনৈতিকীকরণ নিয়ে একটি প্রকাশ্য সেমিনারে অংশ নিয়েছেন। তিনি বলেন, “এরপর আমি বাড়ি ফিরে শান্তিতে ঘুমিয়েছি। হাসিনা আমলে এটি ছিল অকল্পনীয়।”

কিন্তু একই সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলার ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। গণপিটুনি ও মব ভায়োলেন্স যেমন বেড়েছে, তেমনি বিশেষ করে নারীদের হেনস্তা এবং অনলাইন ডক্সিংয়ের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে ১২ ডিসেম্বর, যখন ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে উত্তপ্ত সম্পর্কের কট্টর সমালোচক এবং জেন-জি নেতা শরীফ ওসমান হাদিকে ঢাকার বুকে মুখোশধারী আততায়ীরা গুলি করে হত্যা করে। তাঁর মৃত্যুর পর উত্তেজিত জনতা ঢাকার দুটি শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকের কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়—তাদের অভিযোগ ছিল পত্রিকাগুলো ভারত-পন্থি। আগুনের লেলিহান শিখা যখন ওপরে উঠছিল, তখন কয়েক ডজন সাংবাদিককে সেই ভবনের ছাদে আটকে থাকতে দেখা যায়। ধারণা করা হচ্ছে, জুলাই অভ্যুত্থানে নিজেদের ভূমিকার কারণে জনগণের মনে থাকা তীব্র ঘৃণা ও ক্ষোভের কারণে পুলিশ ও সামরিক বাহিনী তাদের দায়িত্ব পালনে আত্মবিশ্বাস পাচ্ছে না।

রহমান বলেন, “আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন নিশ্চিত করা। সাধারণ মানুষ যাতে রাস্তায় এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে নিজেদের নিরাপদ মনে করে তা নিশ্চিত করা।”

তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক রক্ষাকবচ তৈরির খুব বেশি উদ্যোগ এখনও দেখা যায়নি। নতুন নেতা নির্বাচনের পাশাপাশি বাংলাদেশিরা সাংবিধানিক সংস্কারের ওপর একটি গণভোটেও অংশ নেবে। এর মধ্যে রয়েছে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ গঠন, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার বণ্টন, সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার অধিকার এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদকাল সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্ধারণের মতো বিষয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাংবিধানিক সংস্কার কমিশনের প্রধান আলী রিয়াজ বলেন, গণভোটে নেতিবাচক ফলাফল আসলে তা হবে “অত্যন্ত হতাশাজনক”। তিনি সতর্ক করে বলেন, “এটি দেশকে এমন এক পরিস্থিতিতে ফেলে দেবে যেখানে দেশ আবারও অতীতের অন্ধকারে ফিরে যেতে পারে।”

আওয়ামী লীগকে ব্যালট থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি বুমেরাং হতে পারে যদি আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হয়। শেখ হাসিনা বলেন, “দেশের বৃহত্তম এবং প্রাচীনতম রাজনৈতিক দলকে বাইরে রেখে কোনো নির্বাচন কখনও অবাধ বা সুষ্ঠু হতে পারে না।” তবে আলী রিয়াজ এ বিষয়ে ক্ষমাপ্রার্থী নন। তিনি বলেন, “এটি এমন একটি রাজনৈতিক দল যারা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের মতো জঘন্য কাজ করেছে, অথচ এখনও ক্ষমা চায়নি। তাদের কোনো অনুশোচনা নেই, বরং তারা মানুষকে উস্কানি দিচ্ছে।”

আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা সঠিক ছিল কি না, তা নিয়ে রহমান সরাসরি কিছু বলতে চাননি। তবে নীতিগতভাবে তিনি কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নন। তিনি বলেন, “আজ যদি আপনি একটি রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেন, তবে কাল যে আমাকে নিষিদ্ধ করবেন না তার নিশ্চয়তা কী? তবে হ্যাঁ, কেউ যদি কোনো অপরাধের জন্য দায়ী হয়, তবে অবশ্যই তাকে তার পরিণাম ভোগ করতে হবে।”

রহমানের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশে আশাবাদ জাগালেও বিপ্লব-পরবর্তী সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো ইসলামপন্থার পুনরুত্থান। বাংলাদেশ এমন এক জনপদ যেখানে মুসলিম জনসংখ্যা মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি, পাশাপাশি হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ প্রায় ১০% সংখ্যালঘু মানুষ রয়েছে। সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ হলেও ১৯৮৮ সালে সামরিক একনায়কতন্ত্রের সময় ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করা হয়, যার ফলে সৃষ্ট দ্বৈত অবস্থান কট্টরপন্থীদের জন্য উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

অসংখ্য ভুল থাকলেও হাসিনা চরমপন্থা নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন এবং এমনকি ট্রান্সজেন্ডার সুরক্ষা আইনও স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এসে প্রথম যে কাজগুলো করেছিল তার একটি ছিল ইসলামপন্থী দল জামায়াতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা। চতুর সোশ্যাল মিডিয়া কৌশলের কারণে দলটি এখন বিপুল সংখ্যক তরুণদের সমর্থন পাচ্ছে।

সেপ্টেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন প্রথমবারের মতো বিশাল জয় পায়—যাকে ঐতিহ্যগতভাবে জাতীয় রাজনীতির পূর্বাভাস হিসেবে দেখা হয়। এছাড়া আরও চারটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা জয়লাভ করে। নতুন দল এনসিপি-ও জামায়াতকে সমর্থন দিয়েছে, যার প্রতিবাদে দলটির বেশ কয়েকজন নারী নেত্রী পদত্যাগ করেছেন। রক্ষণশীলদের চাপে এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বাদ পড়া সমকামী অধিকার কর্মী মুনতাসির রহমান বলেন, “এটি নারী নেত্রী এবং সংখ্যালঘুদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”

জামায়াতের সংবিধানে শরিয়াহ আইন চালুর লক্ষ্য থাকলেও তারা বর্তমানে তাদের উগ্র ভাষা কিছুটা নরম করেছে। নিজেদের ‘ফ্যাসিবাদ-বিরোধী’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে তারা সমাজকল্যাণের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে এবং অন্যান্য দলের সাথে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এমনকি একটি সংখ্যালঘু প্রধান আসনে তারা হিন্দু প্রার্থীও মনোনীত করেছে। সমালোচকরা একে কৌশল বললেও অনেক সাধারণ বাংলাদেশি তাদের এই সততার আবরণে বিশ্বাস রাখছেন। জানুয়ারির শুরুতে জামায়াত নেতা এমনকি একজন জ্যেষ্ঠ ভারতীয় কূটনীতিকের সাথে গোপন বৈঠকের কথা প্রকাশ করেছেন—যা অতীতে অকল্পনীয় ছিল। রহমান এ নিয়ে চিন্তিত নন। তিনি বলেন, “মানুষ কেবল একটি গণতন্ত্রে ফিরে যেতে চায় যেখানে তারা মুক্তভাবে কথা বলতে পারবে এবং নিজের মত প্রকাশ করতে পারবে।”

যে পক্ষই ক্ষমতায় আসুক না কেন, ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন তাদের জন্য অগ্রাধিকার হবে। বাংলাদেশ প্রায় তিন দিক দিয়ে এই দক্ষিণ এশীয় পরাশক্তি দ্বারা বেষ্টিত। ভারতের সাথে তাদের ২,৫০০ মাইলের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যা বাংলাদেশি পণ্যের জন্য প্রধান স্থল ট্রানজিট রুট এবং তুলা, শস্য, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ আমদানির বড় উৎস। রহমান বলেন, “আমাদের দেশ এবং জনগণের স্বার্থ দেখা সবার আগে, তবে এরপর আমরা সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করব।”

ভারত হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া এবং আওয়ামী লীগ পন্থী প্রচারণা চালানোর কারণে তরুণ বাংলাদেশিদের চোখে নয়াদিল্লি এখন প্রধান খলনায়ক। আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, “এমনকি তারেক রহমানের মতো নেতার জন্যও নয়াদিল্লির সাথে সম্পর্ক স্থাপনের ডাক দেওয়া রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।”

এটি একটি গভীর প্রজন্মের পরিবর্তনের চিত্র। জামায়াত ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল এবং স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। আর সেই যুদ্ধে ভারত অর্থ, অস্ত্র এবং ৩,৮০০-র বেশি সৈন্যের জীবন দিয়ে বাংলাদেশকে সাহায্য করেছিল। অথচ আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে জামায়াত হলো ‘অপরিণত দুর্নীতিমুক্ত’ শক্তি, আর ভারত হলো ‘চিরশত্রু’।

অতীতের এই বিচ্ছেদ প্রমাণ করে যে, রহমান কেবল তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারবেন না। আজকের বাংলাদেশিদের কাছে অর্ধশতক আগের বীরত্বগাথার চেয়ে এমন একজন নেতা বেশি জরুরি যিনি মানুষের কথা শুনবেন, সেতুবন্ধন তৈরি করবেন এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় স্থিতিশীলতা ও আস্থা বজায় রাখতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করবেন। অর্থনৈতিক সংকট চলতে থাকলে সাধারণ মানুষ হয়তো আবারও হাসিনার আমলের কথা ইতিবাচকভাবে ভাবা শুরু করতে পারে। কুগেলম্যান বলেন, “বংশগত রাজনৈতিক দলগুলোকে কখনও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।” তিনি মনে করিয়ে দেন যে বিএনপিও মাত্র দুই বছর আগে ধ্বংসের মুখে ছিল। “এমনকি শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎও শেষ হয়ে যায়নি। তিনি এখন কোনো প্রভাব ফেলতে না পারলেও ভবিষ্যতে তাঁকে হিসেবে রাখতে হবে।”

রহমান দুর্নীতির ধ্বংসাত্মক প্রভাব সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন হলেও বাংলাদেশের জন্য বিপদ হতে পারে সেই হাজার হাজার নিম্নপর্যায়ের বিএনপি কর্মী, যারা হাসিনার আমলে নির্যাতিত হয়েছেন এবং এখন মনে করছেন যে ‘আখের গুছিয়ে নেওয়ার’ সময় এসেছে। দলের শৃঙ্খলা বজায় রাখা তাঁর জন্য সহজ হবে না।

তবে রহমান তাঁর আগের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়েছেন এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। মে মাসে তিনি নিজেকে এবং তাঁর মাকে নিয়ে আঁকা একটি ব্যঙ্গচিত্র পুনরায় শেয়ার করে লিখেছিলেন যে, “নির্ভীক ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে সম্মান করতে হবে, এমনকি যদি তা আমাদের মতের সাথে না-ও মিলে।” জিয়ার জানাজায় তিনি হাসিনাকে আক্রমণ না করে বরং ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন। হাসিনার ‘আয়রন লেডি’ মূর্তির বিপরীতে রহমান নিজেকে অনেক বেশি নমনীয়ভাবে উপস্থাপন করছেন; তাঁর প্রিয় বিড়াল ‘জেবু’র (একটি সাইবেরিয়ান বিড়াল) ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ ভাইরাল হয়েছে।

লন্ডনের জীবন থেকে তিনি কী বেশি মিস করেন জানতে চাইলে রহমান দ্বিধা ছাড়াই বলেন, “আমার স্বাধীনতা।” নিজের পারিবারিক বাড়ির চারপাশে থাকা ১০ ফুট উঁচু কাঁটাতারের বেড়ার দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, “যখন এই বাড়িতে এসে এত নিরাপত্তা দেখলাম, আমার দমবন্ধ লাগছিল।” লন্ডনের সেই দিনগুলো এখন অতীত, যখন তিনি নিজেই গাড়ি চালিয়ে বা বাজারে গিয়ে সাধারণ মানুষের মতো চলাফেরা করতে পারতেন। এখন প্রতিদিনের ১০,০০০ কদম হাঁটার লক্ষ্য পূরণ করতেও তাঁকে অনেক পরিকল্পনা করতে হবে।

তবে রহমান অভিযোগ করছেন না; তিনি দেখাচ্ছেন যে তাঁর এই ফিরে আসা কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয় বরং এক দৃঢ় সংকল্প—দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের এক প্রতিজ্ঞা। নিজের প্রিয় মুভির একটি উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি কথা শেষ করেন; তবে সেটি এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে নয়, বরং স্পাইডার-ম্যান থেকে: “অসীম ক্ষমতার সাথে জড়িয়ে থাকে বিশাল দায়িত্ব।” তিনি যোগ করেন, “আমি এটি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি।”

Leave a Reply

Back to top button