মার্কিন কূটনৈতিকের ফাঁস করা অডিওর ট্রান্সক্রিপ্ট (বাংলা অনুবাদ)

ওয়াশিংটন পোস্টের সূত্রধরে জুলকারনাইন সায়েরের ফাঁস করা অডিওটি পুরো ট্রান্সক্রিপ্ট করে বাংলা অনুবাদ দেওয়া হলো। কথাগুলো ইউএসএ এম্বাসির একজন কর্মকর্তার।
বিদেশে কর্মরত শ্রমিকরা… যে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছিলেন… ইন্টেরিম গভমেন্টের ওপর যে আস্থা ছিল… মানুষ ইউনূসকে এমন একজন হিসেবে দেখেছে যাকে বিশ্বাস করা যায়, আর সেই কারণে তারা আবার আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে টাকা পাঠাতে শুরু করেছে… এটা ছিল বিশাল ব্যাপার।
আর আরএমজি খাত এক মুহূর্তের জন্যও থেমে যায়নি।
আমি এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর লোকজনের কাছ থেকেও শুনেছি… তারা বলেছে শ্রীলঙ্কা এত কম সহায়তা নিয়ে এমন পরিস্থিতি কখনোই টিকতে পারত না…
সুতরাং অনেক কিছুই ঠিকঠাক হয়েছিল, বিশেষ করে অর্থনীতির ম্যাক্রো ব্যবস্থাপনা ছিল খুবই ভালো।
আমি মনে করি, হাসিনার সাজার মতো বিষয়গুলো… রাজনৈতিকভাবে একেবারে জিনিয়াস সিদ্ধান্ত।
ওরা চলে যাওয়ার আগেই ওই রায় বের করতে পেরেছে—এটা সত্যিই অবাক করার মতো।
আর আইসিটি কোনো ট্রাইব্যুনাল নয়…
আমরা স্বীকার করি, এটা ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ট্রায়াল ছিল না… যাই হোক।
কিন্তু সে দোষী ছিল, আর তারা সেটা প্রমাণ করেছে।
আর তারা সেটা তাদের ম্যান্ডেটের মধ্যেই করেছে,এটাই সবচেয়ে ইমপ্রেসিভ।
ছাত্ররা যখন কোনো বাস্তব রাজনৈতিক দল গঠন করতে ব্যর্থ হলো, তখন বিএনপিকে ইউনূস যেভাবে ম্যানেজ করলেন… সেটা ছিল জিনিয়াস!
তার লন্ডনে গিয়ে তারেকের সঙ্গে আলোচনা করা,
এটা এমন এক স্তরের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, যা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি,
সে ক্ষমতা তার আছে বলে তখন আমাদের কেউই ভাবিনি।
এমন অনেক সময়ই এসেছে যখন আমরা ভেবেছি…
তার অক্ষুণ্ন আন্তর্জাতিক সুনাম বজায় রেখে সরে যাওয়াই বোধহয় সবচেয়ে নিরাপদ পথ,
সেগুলোই ছিল হুমকির মুহূর্ত।
কিন্তু তিনি সেনাবাহিনীর কাছে মাথা নত করেননি।
যা কিছুই ঘটে থাকুক না কেন,
তিনি অলিগার্কদের কাছেও নতি স্বীকার করেননি,
রাজনৈতিক দলগুলোর কাছেও না।
অনেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তার আচরণ নিয়ে সমালোচনা করেছে।
কিন্তু তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন,
“এটা তোমাদের সমস্যা। এটা তোমাদের সমস্যা। এটা তোমাদের সমস্যা।
তোমাদের নিজেদের মধ্যে কথা বলতে হবে।
তোমাদের দলগুলো একে অপরের সঙ্গে কথা বলছে।”
জামায়াত আর বিএনপি,
একজন আরেকজনের স্পিড ডায়ালে আছে…
আর অর্থনীতি,
শেষের দিকে কিছু সংস্কার ঢুকানো হচ্ছে।
আমি বলছি,
পুরো জুলাই চার্টার, এই রেফারেন্ডাম—
কে বুঝবে, কে বুঝবে না—,এসব নিয়ে আমরা সমালোচনা করতেই পারি, ব্লা ব্লা ব্লা…
কিন্তু জামায়াত আর রেফারেন্ডাম যেভাবে ম্যানেজ করা হয়েছে,
নির্বাচনের দিন ওদের বলা হবে, চুপ থাকো।
আর বিএনপিকেও বলা হবে,
যেসব বিষয়ে তোমরা একমত হওনি,সেগুলো নিয়েও চুপ থাকো…
নাহয় এখান থেকে বেরিয়ে যাও।
আর তারা বেরিয়ে যায়নি।
সুতরাং আমার মনে হয় আমরা যা শনাক্ত করেছি তা হলো,
বাংলাদেশে একটা বিশাল অদৃশ্য সামাজিক সংহতির শক্তি আছে।
৫ আগস্ট থেকে যতবারই আমরা ভেবেছি সবকিছু ভেঙে পড়বে,
৫ আগস্ট থেকেই,
আমরা সেদিনই লোকজনকে সরিয়ে নিয়েছিলাম।
আজ সকালেই এ নিয়ে আমাদের একটা মিটিং হয়েছে।
এক মাস পর আমরা ওয়াশিংটনে ফিরে বলছিলাম,
“না, সবাই ফিরে আসতে পারে (লীগ)।”
ওরা বলেছিল,
“তোমরা পাগল! এটা অসম্ভব।”
আর আমাদের ওদের বোঝাতে হয়েছিল,
বাংলাদেশি সমাজ দ্বিতীয়বারের মতো নিজে থেকেই উঠে দাঁড়িয়েছে,
সরকার ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছে।
আমি মনে করি না তোমরা নিজেরাই নিজেদের যথেষ্ট কৃতিত্ব দাও,
যা বারবার ঘটছে তার জন্য।
কারণ এটা শুধু দল না, সরকারও না,
মানুষ আর দলগুলোই,
বারবার সংঘাত থেকে পিছিয়ে আসছে।
এই কারণেই আমি একদমই বিশ্বাস করি না যে জামায়াত শরিয়া আইন চাপিয়ে দিতে পারবে।
সেদিন আমি ক্যাথলিক চার্চের একজনের সঙ্গে কথা বলছিলাম।
তিনি বলছিলেন,
“জামায়াত জিতলে তারা সেক্রেড হার্ট আর সব ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয়করণ করবে,
আর সেগুলো দখল করে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় বানাবে। (নটরডেম, হলিক্রস এসবের কথা বলছে)”
আমি বলেছিলাম,
বাংলাদেশে যদি জামায়াত সব ক্যাথলিক স্কুল দখল করে নেয়…
পরের দিনই তাদের ওপর ১০০% শুল্ক বসবে।
আমেরিকার ক্যাথলিক সমাজ এটা কোনোভাবেই মেনে নেবে না,
আর বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি করতে দেবে না।
সুতরাং এটা বাস্তব কোনো বিষয়ই না।
আর আমাদের সরকার হয়তো এখানে নেতৃত্ব দেবে না, কিন্তু
বাংলাদেশের পুরো অর্থনীতি,
যুক্তরাষ্ট্রে আপনার রপ্তানির ২০% নির্ভর করে এমন কিছু সামাজিকভাবে উদার পোশাক ব্র্যান্ডের ওপর,
যারা আপনার কারখানাগুলোকে আজ বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক ও নিরাপদ করেছে।
ওই রপ্তানি…
ভেতরেরগুলো যেগুলো [শোনা যায়নি]…
যদি বাংলাদেশে বলা হয়,
নারীরা দিনে পাঁচ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে পারবে না,
নির্দিষ্ট মজুরিতে আরএমজি বানাতে হবে,
আর শরিয়া আইন চাপানো হয়,
তাহলে কোনো অর্ডার থাকবে না।
আর অর্ডার না থাকলে,
বাংলাদেশি অর্থনীতিও থাকবে না।
জামায়াত এটা করবে না
কারণ সেখানে খুব বেশি বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষিত, বুদ্ধিমান মানুষ আছে।
আমরা তাদের খুব পরিষ্কার করে জানিয়ে দেব
এর পরিণতি কী হবে।
ইউরোপিয়ানরাও একইভাবে জানিয়ে দেবে।
একটা ব্যাপার হলো, আপনি সৌদি আরব,
আর আরেকটা ব্যাপার হলো, আপনি বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ সৌদি আরব হতে পারে না।
তাই…
আমি আপনাদের উৎসাহ দেব,
আর জামায়াত নিয়ে আমাদের অবস্থান হলো,
আমরা জামায়াতের সঙ্গে কথা বলব।
হেফাজতের সঙ্গে কথা বলব।
ইসলামি আন্দোলনের সঙ্গেও কথা বলব।
আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক।
কারণ আমরা চাই ফোন তুলে বলতে,
“তুমি এই কথাটা বলেছ, এর পরিণতি হবে এটা।”
কারণ তারা বোকা না।
তারা বোকা না।
তারা পাগলও না।
এর মানে এই না যে সবকিছু রক্ষা করা যাবে,
কিছু জিনিস বদলাবে না,তা নয়।
এই লড়াই মূলত আপনাদেরই।
এই কারণেই ওদের দিকের নারীদের সঙ্গে কথা বলা জরুরি।
সংলাপে যাওয়াটা জরুরি।
আমি জানি, এটা কঠিন।
তবুও আমরা কথা বলি।
আপনাদের অনেকেরই এমন অভিজ্ঞতা হয়
একই পাঁচটা কথা বারবার শুনতে হয়।
আমরা চাই,
সংস্কারপন্থী জামায়াতের লোকদের সামনে আনতে,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা জিতেছে,সেই লোকগুলোকে।
আপনি কি ওদের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন?
ওরা কি আপনার শোতে আসবে?
আমরা আসলে শুধু পথ খুঁজছি,
মানুষের সঙ্গে কথা বলার, সংযোগ করার।
কারণ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশি মানুষই।
একটা পরিবর্তন হয়েছে।
ওরা ডান দিকে গেছে।
ওরা আরও ইসলামমুখী হয়েছে।
যদি তা না হয়,
যদি নির্বাচন সে রকম না হয়, দারুণ।
তাহলে একমাত্র সমস্যা হবে,
বিএনপি নিজের দুর্নীতিতে নিজেই ভেঙে পড়বে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো,
সম্ভবত জামায়াত আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো করবে।
তারা টেবিলে থাকবে,
আর সেটা কঠিন হবে।
কিন্তু আমি মনে করি না,
পুরোপুরি আতঙ্ক ছড়ানো কোনো কাজে আসে।
কারণ গার্ডরেইল আছে।
ওরা একটা সীমার বেশি যেতে পারবে না।
আপনাদের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি প্রায় পুরোপুরি পশ্চিমের ওপর নির্ভরশীল।
আপনি যদি সব চীনে বিক্রি করতেন,
তাহলে আপনি বড় বিপদে পড়তেন।
কারণ ওরা কিছুই পরোয়া করে না।
কিন্তু আপনি তা করেন না।
আপনি যুক্তরাষ্ট্র আর ইউরোপে বিক্রি করেন।
আর আমাদের সরকার যদি না-ও ভাবে,
আমাদের ভোক্তারা ভাবে।
আমাদের কোম্পানিগুলো ভাবে।
তারা তাদের সুনাম নিয়ে ভাবে।
এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবে।
সোর্সঃ ©IntraView

