Bd বাংলাদেশ

পাকিস্তান-তুরস্ক-সৌদি প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ!

প্রবাস কন্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট:

জাতীয় নির্বাচনের পর বাংলাদেশ উদীয়মান পাকিস্তান-তুরস্ক-সৌদি আরব প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হতে পারে। এমন জল্পনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করতে দুই দেশ একটি যৌথ প্রক্রিয়া বা মেকানিজম গড়ে তুলেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে আগের সরকারের পতনের পর এই প্রক্রিয়া আরও গতি পায়। ইসলামাবাদ ও ঢাকার মধ্যে সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের সামরিক যোগাযোগ এবং পাকিস্তান-সৌদি আরবের মধ্যে বিদ্যমান কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি এই আলোচনাকে আরও তীব্র করেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইসলামাবাদ। এতে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদলের পর আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে যে পরিবর্তন এসেছে, তার প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে- নির্বাচনের পর বাংলাদেশে গঠিত নতুন সরকার কি এই ধরনের কৌশলগত প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিক রূপ দেবে এবং এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোয় নতুন মাত্রা যোগ করবে?

এই সম্ভাব্য জোটের ভিত্তি গড়ে ওঠে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে স্বাক্ষরিত পাকিস্তান-সৌদি আরব কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে। এই চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এক দেশের ওপর যে কোনো আগ্রাসনকে উভয় দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এটি প্রতিষ্ঠিত সামরিক জোটগুলোর মতোই সমষ্টিগত নিরাপত্তা নীতির প্রতিফলন। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইলকে ঘিরে চলমান সংঘাত, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটেই এই চুক্তির জন্ম। পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের অবস্থান এবং দীর্ঘদিন ধরে সৌদি বাহিনীর জন্য পাকিস্তানের সামরিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিই এই সহযোগিতার মূল ভিত্তি ছিল, যা এখন একটি বাধ্যতামূলক কাঠামোয় রূপ পেয়েছে।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান-সৌদি আরবের এই জোটে যোগ দেয়ার বিষয়ে উন্নত পর্যায়ের আলোচনায় রয়েছে তুরস্ক। ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এই আলোচনা দ্রুত অগ্রসর হয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মধ্যে রয়েছে যৌথ নৌযান নির্মাণ এবং এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের আধুনিকায়ন। অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্কও অর্থনৈতিক ও সামরিক উভয় ক্ষেত্রেই উন্নত হচ্ছে। তুরস্ক যদি আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়, তাহলে এই জোটটি একটি শক্তিশালী ত্রিপাক্ষিক সামরিক ব্লকে রূপ নিতে পারে। এর লক্ষ্য হবে অভিন্ন হুমকি মোকাবিলা এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চলে পারস্পরিক সামরিক সক্ষমতা ও সমন্বয় বাড়ানো।

পাকিস্তানের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আগ্রহী বাংলাদেশ। বাংলাদেশের সামরিক নেতৃত্বও পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি কাঠামোর আদলে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে গভীর আগ্রহ দেখিয়েছে। জ্যেষ্ঠ কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করতে দুই দেশ একটি যৌথ প্রক্রিয়া বা মেকানিজম গড়ে তুলেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে আগের সরকারের পতনের পর এই প্রক্রিয়া আরও গতি পায়। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত হয় এবং প্রতিরক্ষা বিনিময় জোরদার হয়। ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে পাকিস্তানের একাধিক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ঢাকা সফর করেছেন। সেখানে যৌথ প্রশিক্ষণ, সন্ত্রাসবাদ দমন এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই উষ্ণ সম্পর্কের প্রতিফলন দেখা যায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সফরে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে পাকিস্তানের চেয়ারম্যান জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটি ঢাকা সফর করে নিয়মিত বিনিময় কর্মসূচি ও যৌথ মহড়ার বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছান। পরবর্তী আলোচনাগুলোতে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং অপারেশনাল সমন্বয়ের বিষয়ও উঠে আসে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রধানের পাকিস্তান সফরে চীনের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়, যা প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে বাস্তব রূপ দেয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত। এই পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে কৌশলগত বৈচিত্র্য আনার নীতির প্রতিফলন, যেখানে দেশটি ঐতিহ্যগত নির্ভরতার বাইরে গিয়ে নতুন অংশীদার খুঁজছে।

নির্বাচন-পরবর্তী সিদ্ধান্তই জানা যাবে এই চুক্তি আনুষ্ঠানিক রূপ পাবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করছে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ওপর। নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকারই খসড়া চুক্তি পর্যালোচনা ও অনুমোদনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। যদিও খসড়া নিয়ে অগ্রগতি স্থিরভাবে এগোচ্ছে, তবু সূত্রগুলো বলছে- নতুন সরকারের অগ্রাধিকারই চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করবে। বাংলাদেশের ফোর্সেস গোল ২০৩০ আধুনিকায়ন কর্মসূচির সঙ্গে পাকিস্তানের মতো অংশীদারদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ সরঞ্জাম গ্রহণের লক্ষ্য ভালোভাবেই মিলে যায়। এর আওতায় যৌথ মহড়া ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগও তৈরি হতে পারে।

এই উদ্যোগের প্রভাব শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, অন্তত আটটি দেশ পাকিস্তানের সঙ্গে অনুরূপ কৌশলগত ব্যবস্থায় আগ্রহ প্রকাশ করেছে, যা ইসলামাবাদের বিস্তৃত প্রতিরক্ষা কূটনীতির ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই জোটে যুক্ত হওয়া নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দিতে পারে এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বে বৈচিত্র্য আনতে সহায়ক হতে পারে। বিশেষত প্রতিবেশী কিছু দেশের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে। তবে ইতিহাসজনিত সংবেদনশীলতার কারণে বিষয়টি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিকভাবে সতর্কতার সঙ্গে সামলাতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের সম্প্রসারিত জোট মুসলিমঅধ্যুষিত দেশগুলোর নিরাপত্তা সমন্বয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে এবং দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও এখনো এটি আনুষ্ঠানিকভাবে চার-পক্ষীয় কাঠামো নয়, তবু সন্ত্রাসবাদ দমন, প্রশিক্ষণ ও প্রতিরক্ষা উৎপাদনে অভিন্ন স্বার্থ ভবিষ্যতে আরও গভীর সহযোগিতার দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

অনিশ্চয়তার মধ্যে নতুন সমীকরণ বিশ্বব্যাপী অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে এই ঘটনাপ্রবাহ জোট ও অংশীদারিত্বের নতুন সমীকরণের প্রতিফলন, যেখানে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি প্রতিরোধ ক্ষমতা ও কৌশলগত গভীরতা বাড়ানোর হাতিয়ার হয়ে উঠছে। নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই নজর রাখা হচ্ছে- বাংলাদেশের নতুন সরকার কোন পথে পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতি নির্ধারণ করে।

 

বার্তা বাজার/এস এইচ

 

প্রবাস কন্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট/আ/মু

Source: bartabazar.com

Leave a Reply

Back to top button