জুলাই কন্যা তাহরিমার মায়ের করা মামলায় নিরব পুলিশ!

প্রবাস কন্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট:
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ও ‘জুলাই যোদ্ধা’ তাহরিমা জান্নাত সুরভী পুলিশের কাছ থেকে ন্যায়বিচার পাননি—এমন অভিযোগ উঠেছে। যাঁর মামলায় সুরভীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধেই এর আগে সুরভীর মা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারায় কালিয়াকৈর থানায় মামলা দায়ের করেছিলেন। তবে ওই মামলায় পুলিশ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। বরং সুরভীকেই গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয় এবং আদালতে ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে আদালত ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
সোমবার রাতে কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর এ ঘটনায় একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসে। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গত ২৬ নভেম্বর কালিয়াকৈর থানায় একই দিনে সুরভীর পক্ষে ও বিপক্ষে দুটি মামলা নথিভুক্ত হয়। একটি মামলা করেন নাইমুর রহমান দুর্জয় (মামলা নম্বর ৩৮), যেখানে সুরভীসহ চারজনকে আসামি করা হয়। অপরদিকে সুরভীর মা মোসা. ছামিতুন আক্তার দায়ের করেন মামলা নম্বর ৪০, যেখানে একমাত্র আসামি করা হয় নাইমুর রহমান দুর্জয়কে।
মোস্তাফিজুর রহমান কামাল বলেন, একই দিনে দুটি মামলা দায়ের হলেও প্রায় এক মাস পর পুলিশ অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও দুর্জয়ের মামলায় সুরভীকে গ্রেপ্তার করে। অথচ সুরভীর মায়ের করা মামলায় কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
তিনি আরও বলেন, গভীর রাতে বাড়িতে অভিযান চালিয়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক সুরভীকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কারাগারে পাঠানো হয়। আদালতে হাজির করার সময় পুলিশ সুরভীর প্রকৃত বয়স সংক্রান্ত সঠিক তথ্য উপস্থাপন করেনি। এমনকি রিমান্ড আবেদনে তাঁর বয়স ২১ বছর উল্লেখ করা হয়, যা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই মনে হচ্ছে।
এ কারণে আদালত তদন্ত কর্মকর্তাকে শোকজ করেছেন জানিয়ে মোস্তাফিজুর রহমান কামাল বলেন, ‘আমরা আশা করছি, এই ঘটনায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।’
সুরভীর মায়ের মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত জুলাই–আগস্টের ছাত্র আন্দোলনে সরাসরি অংশ নেন ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির ওই ছাত্রী। সেই সূত্রে তাঁর সঙ্গে সাংবাদিক নাইমুর রহমান দুর্জয়ের পরিচয় হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, পরিচয়ের পর থেকেই দুর্জয় তাঁকে হোয়াটসঅ্যাপে কুপ্রস্তাব ও কক্সবাজার ভ্রমণের প্রস্তাব দিতে থাকেন। ছাত্রীটি এতে আপত্তি জানালে দুর্জয় ক্ষমা চান।
অভিযোগে বলা হয়, কৌশলে পানি কেনার কথা বলে ছাত্রীটি সেখান থেকে সরে গিয়ে তাঁর কলেজের বড় ভাইদের বিষয়টি জানান। পরে তাঁরা এসে তাঁকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে দুর্জয় নিজের অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চান এবং তাঁর কাছে থাকা কুপ্রস্তাবমূলক অডিও ক্লিপ মুছে ফেলতে কান্নাকাটি ও আত্মহত্যার হুমকি দেন।
পরদিন ১৯ নভেম্বর সফিপুরের একটি রেস্টুরেন্টে বসে মানসিক চাপ ও হুমকির মাধ্যমে কিছু অডিও ক্লিপ জোরপূর্বক ডিলিট করিয়ে দুর্জয় সেখান থেকে চলে যান বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
বাদী ছামিতুন আক্তার এজাহারে বলেন, মানসিকভাবে ভেঙে পড়ায় এবং পারিবারিক ও সামাজিক সম্মানের কথা বিবেচনায় থানায় অভিযোগ দিতে কিছুটা দেরি হয়। তবে তিনি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।
নাইমুর রহমান দুর্জয় কিশোরগঞ্জের মিঠামইন থানার বৈশর গ্রামের সাজ্জাদ হোসাইনের ছেলে। বর্তমানে তিনি ঢাকার সবুজবাগ এলাকায় বসবাস করছেন।
এদিকে গত ২৪ ডিসেম্বর দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে গাজীপুরের টঙ্গীতে নিজ বাসা থেকে যৌথ বাহিনী সুরভীকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
পরে তাঁকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। সোমবার দুপুরে গাজীপুর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এ হাজির করে পুলিশ ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে বিচারক সৈয়দ ফজলুল মাহাদী ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
দিনভর জুলাই যোদ্ধাদের আন্দোলন ও সন্ধ্যায় রিভিশন আবেদনের শুনানি শেষে জেলা ও দায়রা জজ আদালত রিমান্ড বাতিল করে জামিন মঞ্জুর করলে সন্ধ্যা ৭টার দিকে গাজীপুর জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান সুরভী।
কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাসির উদ্দিন বলেন, একই তারিখে পক্ষে-বিপক্ষে দুটি মামলা দায়েরের বিষয়টি তিনি আজই জানতে পেরেছেন।
এক মামলায় সুরভীর বয়স ১৭ উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও তাঁকে গ্রেপ্তার এবং অন্য মামলায় ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আদালত তদন্ত কর্মকর্তাকে শোকজ করেছেন। তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে জবাব দেওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বার্তাবাজার/এমএইচ
প্রবাস কন্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট/আ/মু
Source: bartabazar.com

