বৈধ বিএনপির ২ প্রার্থী, বাদ জামায়াত-এনসিপির দুজন

প্রবাস কন্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট:
দ্বৈত নাগরিকত্ব বিতর্ক
বৈধ বিএনপির ২ প্রার্থী, বাদ জামায়াত-এনসিপির দুজন
০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৩৯ PM
, আপডেট:
০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:১৬ PM

নির্বাচন কমিশনের লোগো © সংগৃহীহ ও টিডিসি সম্পাদিত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার পর মনোনয়নপত্র দাখিল ও যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াকে ঘিরে দেশজুড়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল ২৯ ডিসেম্বর। এরপর ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত সারাদেশের রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হয়। তবে যাচাই-বাছাইয়ের ফলাফল প্রকাশের পরই বিভিন্ন জেলায় রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে।
একাধিক প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের অভিযোগ, একই ধরনের ত্রুটি বা অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এক প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হলেও অন্য প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে নির্বাচনি প্রতিযোগিতায় সমতা নষ্ট হচ্ছে এবং নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মনোনয়ন বাতিল হওয়া প্রার্থীদের অনেকেই ইতোমধ্যে আপিলের প্রস্তুতি নিয়েছেন বলেও জানান তারা।
জানা যায়, বাংলাদেশের সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, ‘দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা ব্যক্তিরা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন না, কারণ এটি ‘আনুগত্যের দ্বন্দ্ব’ বা স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে। আইন অনুযায়ী, প্রার্থীকে অবশ্যই বাংলাদেশের একচ্ছত্র নাগরিক হতে হবে এবং অন্য কোনো দেশের প্রতি আনুগত্য থাকা যাবে না।’
আমার ডকুমেন্টস এবং বিএনপির প্রার্থীর ডকুমেন্টস যাচাইয়ের একমাত্র গ্রহণযোগ্য উপায় ছিল যুক্তরাজ্যের হোম অফিস থেকে অফিসিয়াল কনফার্মেশন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে আমার ক্ষেত্রে বলা হলো—হোম অফিস থেকে আনতে হবে, আর বিএনপির প্রার্থীর ক্ষেত্রে বলা হলো—হোম অফিস বন্ধ, আজ লাস্ট ডেট, তাই কন্ডিশনালি দেয়া হলো- এহতেশামুল হক, সিলেট-১ আসনে এনসিপির প্রার্থী
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য মতে, বৃটেনের পদ্ধতি অনুসরণ করেই বৃটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেছেন সিলেট-৩ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এম এ মালেক, ফেনী-৩ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আবদুল আওয়াল মিন্টু, কুড়িগ্রাম-৩ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মাহবুব আলম সালেহী, সিলেট-১ (মহানগর ও সদর) আসনের জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মনোনীত প্রার্থী এহতেশামুল হক, দিনাজপুরের একটি আসনে বিএনপির আরেক প্রার্থী। এছাড়া আরো কয়েকজন জন একই পদ্ধতিতে বৃটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন জমা দিয়েছেন। সেই সঙ্গে দ্বৈত নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করেছেন বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। প্রমাণ হিসেবে নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য মার্কিন দূতাবাসে আবেদন করার তথ্য দাখিল করেছেন।
আরও পড়ুন: ঢাবির স্থিতিশীলতার ওপর জাতীয় নির্বাচনের অনেক প্রভাব রয়েছে
সেক্ষেত্রে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট ধারায় বলা আছে যে, দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে এ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তিনি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেছেন বলে গণ্য হবেন না। সেই হিসেবে একই জটিলতায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হলেও অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে জামায়াত মনোনীত মাহবুব আলম সালেহীও এনসিপির প্রার্থী এহতেশামুল হক। একই জটিলতায় কোন প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ আবার কোন প্রার্থীর অবৈধ ঘোষণাকে চরম বৈষম্য ও কর্তৃপক্ষের দ্বৈত নীতির প্রকাশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট প্রার্থীরা।
কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুর) আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মাহবুব আলম সালেহী বলেন, কুড়িগ্রাম জেলার ডিসি অন্নপূর্ণা দেবনাথ আমাদের কথা না শুনে ভুল সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। আমাদের কাগজপত্র না দেখেই তিনি তার মতো ঘোষণা দিয়ে চেয়ার থেকে উঠে চলে গেছেন। তার মানে হল, কারো প্রেসারের কারণে, অথবা অন্য কারো মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে তিনি এই ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা তার এই ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করব। ন্যায়বিচার পাব ইনশাআল্লাহ।
সিলেট-১ (মহানগর ও সদর) আসনের জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মনোনীত প্রার্থী এহতেশামুল হকে বলেন, ‘আমার ডকুমেন্টস এবং বিএনপির প্রার্থীর ডকুমেন্টস যাচাইয়ের একমাত্র গ্রহণযোগ্য উপায় ছিল যুক্তরাজ্যের হোম অফিস থেকে অফিসিয়াল কনফার্মেশন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে আমার ক্ষেত্রে বলা হলো—হোম অফিস থেকে আনতে হবে, আর বিএনপির প্রার্থীর ক্ষেত্রে বলা হলো—হোম অফিস বন্ধ, আজ লাস্ট ডেট, তাই কন্ডিশনালি দেয়া হলো। এটি কী বৈষম্য নয়?
রিটার্নিং কর্মকর্তাদের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে কোনো একটা দলের দিকে তারা ঝুঁকে আছেন। বড় অভিযোগ থাকার পরও বিএনপি প্রার্থীদের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা হচ্ছে। আবার সামান্য ভুলেও অন্য প্রার্থীদের মনোনয়ন অবৈধ ঘোষণা করা হচ্ছে- আখতার হোসেন, এনসিপির সদস্য সচিব
এদিকে মনোনয়ন যাচাই-বাছাই ঘিরে এই বিতর্ক নির্বাচনের সামগ্রিক পরিবেশকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। আপিল শুনানি শেষে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর নির্বাচনি মাঠে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতাই আসন্ন নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন অন্য প্রার্থীরাও।
এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তাদের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে কোনো একটা দলের দিকে তারা ঝুঁকে আছেন। বড় অভিযোগ থাকার পরও বিএনপি প্রার্থীদের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা হচ্ছে। আবার সামান্য ভুলেও অন্য প্রার্থীদের মনোনয়ন অবৈধ ঘোষণা করা হচ্ছে।
একই ধরনের পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত। এই অবস্থায় আমি মনে করি, স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। একই আইন যদি ভিন্নভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে তা নিশ্চিতভাবেই নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করবে- অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলাম, রাজনীতি বিশ্লেষক
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের এই বিতর্ক আসলে বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতার প্রতিফলন। একই আইনি অবস্থানে থাকা প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ হলে তা স্বাভাবিকভাবেই পক্ষপাতিত্বের অভিযোগকে উসকে দেয়। দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিষয়ে সংবিধান ও আইনের ব্যাখ্যা প্রয়োগে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের মধ্যে একরূপতা না থাকাই এই সংকটের মূল কারণ। আইনের ব্যাখ্যা যদি ব্যক্তি বা পরিস্থিতিভেদে বদলে যায়, তাহলে সেটি আইনের শাসনের পরিপন্থী। এমন ঘটনা ঘটলে এখানে শুধু কোন প্রার্থী বা কোন দল ক্ষতিগ্রস্ত হলো তা নয়, বরং পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়বে। আপিল পর্যায়ে নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে একটি স্পষ্ট ও দৃষ্টান্তমূলক সিদ্ধান্ত দেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে এমন বৈষম্যের অভিযোগ আর না ওঠে। স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ আচরণ নিশ্চিত করা না গেলে নির্বাচনের ফলাফল গ্রহণযোগ্য হলেও রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যাবে, যা গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার জন্য ভালো বার্তা নয়।
রাজনীতি বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলাম বলেন, যদি এমন হয় যে দ্বৈত নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে একজন প্রার্থী বাতিলের আবেদন করে বৈধতা পেয়েছেন, কিন্তু অন্য একজন বৈধতা পাননি, তাহলে সেখানে স্পষ্ট ভিন্নতা দেখা যায়। ডকুমেন্টেশন ঠিকমতো জমা দিতে না পারার মতো কোনো বিষয় আছে কি না, সেটাও খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। একই আইনের আওতায় ভিন্ন ভিন্ন প্রার্থীর ক্ষেত্রে যদি ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যেমন জামায়াত বা বিএনপির কোনো প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়, তাহলে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
আরও পড়ুন: জামিনে মুক্ত জুলাইযোদ্ধা সুরভী
তিনি আরও বলেন, এই ভিন্নতা আসলে কেন হচ্ছে, সেটাই মূল প্রশ্ন। কোনো প্রার্থী হয়তো ডকুমেন্টেশন ঠিকমতো দিতে পারেননি, আবার কোনো প্রার্থী সঠিকভাবে সব কাগজপত্র জমা দিয়েছেন, এমনটা হতে পারে। তবে ভেতরের বাস্তব পরিস্থিতি তো আমি জানি না। গণমাধ্যমে যা দেখা যাচ্ছে, তা হলো একই ধরনের পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত। এই অবস্থায় আমি মনে করি, স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। একই আইন যদি ভিন্নভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে তা নিশ্চিতভাবেই নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করবে।
নির্বাচন কমিশনের বিধি অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল দায়ের করা হলে কমিশন তা শুনানি করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে। সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের আশা, আপিল পর্যায়ে ন্যায়সঙ্গত বিচার পাওয়া যাবে এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর পুনর্বিবেচনা হবে।
নির্বাচন কমিশন বলছে, যাচাই-বাছাইয়ের পুরো প্রক্রিয়া সংবিধান, নির্বাচনি আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে। কমিশনের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, কোনো ধরনের রাজনৈতিক পক্ষপাত বা প্রভাবের সুযোগ নেই এবং আপিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সব অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হবে।
এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব কে. এম. আলী নেওয়াজ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আপিলে অনেকের মনোনয়নপত্র বৈধ হওয়ার সুযোগ থাকে। হয়তো শুনানিতে মনোনয়ন টিকে যেতে পারে। যদি আইনি গ্রাউন্ড থাকে।’
প্রবাস কন্ঠ ডেস্ক রিপোর্ট/আ/মু
Source: thedailycampus.com










